পিআরআইয়ের আলোচনা সভায় বক্তারা

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নীতি গ্রহণে সতর্ক হতে হবে বাংলাদেশকে

বিশ্ব অর্থনীতির চেহারা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। অর্থনীতিতে আগে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতা ও মাথাপিছু আয় গুরুত্ব পেলেও এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি।

ভূরাজনৈতিক সংকট, মেরুকরণ ও যুদ্ধের কারণে পৃথিবীজুড়েই অস্থিরতা বিরাজ করছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে যেকোনো নীতি গ্রহণে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) আয়োজনে গতকাল এক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন বক্তারা। রাজধানীর বনানীতে পিআরআই কার্যালয়ে ‘‌উন্নয়ন কৌশল ও নীতিগত স্বাধীনতা: বাংলাদেশের উন্নয়নের পথপরিক্রমা’ শীর্ষক এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনায় মূল বক্তা হিসেবে অংশ নেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি টিকে থাকার জন্য পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু যখন অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের প্রশ্ন এল, দেশটি তখন সম্পূর্ণ স্বাধীন নীতি অনুসরণ করেছিল। ভিয়েতনামও বিশ্বব্যাংকের বড় অংকের ঋণ প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল। আবার ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে চরম দুর্নীতি থাকা সত্ত্বেও সেখানকার স্থানীয় ধনী ও নীতিনির্ধারকরা দেশের অভ্যন্তরেই পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন।’

অথচ বাংলাদেশে ঠিক তার উল্টো চিত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখানকার রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও অভিজাতরা দেশের টাকা বিদেশে পাঠায়; সামান্য চিকিৎসার জন্যও লন্ডন বা সিঙ্গাপুরে ছোটেন। ফলে আমাদের মাঝে সামাজিক আস্থা তৈরি হয়নি। নাগরিক সমাজে বিভাজন থাকলেও মানুষের মধ্যে আস্থা না থাকলে শুধু অর্থনৈতিক নীতি দিয়ে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা সম্ভব নয়। এ আস্থার সংকট দূর করার পাশাপাশি বৈশ্বিক নানা বিষয় মাথায় রেখে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

উদ্বোধনী বক্তব্যে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, ‘উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ কী নিজস্ব কোনো কৌশল অনুসরণ করেছে, নাকি বৈদেশিক সাহায্য ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আধিপত্য মেনে নিয়েছে? বর্তমান ভূরাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতির বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির এ সংকটময় মুহূর্তে আমাদেরকে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আমরা স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ পেছানো না পেছানো নিয়ে কথা বলছি, অথচ বিশ্ব অর্থনীতির চেহারাই এখন বদলে গেছে। বর্তমানে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সংকট এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে মেরুকরণ এবং যুদ্ধের কারণে পৃথিবী এখন খণ্ড-বিখণ্ড অবস্থায় রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে সতর্কভাবে নীতি গ্রহণ করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নতি করলেও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা খুব একটা জোরদার করতে পারেনি। যদিও দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যত বেড়েছে, নীতিগত স্বাধীনতার পরিসরও তত বিস্তৃত হয়েছিল। তবে নীতিগত স্বাধীনতা শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নয়, দেশের ভেতরেও বজায় রাখতে হয়।’

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ‘আমরা যে সামান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে পেরেছি, তার জন্য বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখনো ঋণের দিকেই ঝুঁকছি।’ ভবিষ্যতে এ ঋণের অর্থ পরিশোধ করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘উন্নয়ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ারই অংশ। আমাদের রাজনৈতিক শক্তিগুলো অতীতের ভুল বা সাফল্য থেকে শিখতে পারছে কিনা, এটি অত্যন্ত মৌলিক একটি প্রশ্ন। দেশে রাজনৈতিক শ্রেণী, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ীদের কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী সংস্কারের বিরুদ্ধে একাট্টা। তারা বিদ্যমান অকার্যকর ব্যবস্থা থেকেই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়। টেবিলে বসে সংস্কারের নানা কথা ঠিকই বলে, কিন্তু নেপথ্যে কোনো না কোনোভাবে তারা সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করে। আর এ কারণেই কর ব্যবস্থা, ব্যাংক খাত বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আমরা বাস্তব কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না।’

আলোচনায় আরো অংশ নেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেসের ডিন ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম; বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি রেজওয়ান সেলিম এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন।

আরও